আদরিণী

আদরিণীঃ প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়

দ্বাদশ শ্রেণির বাংলা তৃতীয় সেমিস্টারে একটিই বাংলা গল্প রয়েছে। সেটি হল প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘আদরিণী’। গল্পের নামচরিত্র একটি গৃহপালিত হাতি। তাকে ঘিরেই গল্পের সূচনা এবং সমাপ্তি। গল্পটি সাতটি অধ্যায়ে বিভক্ত। এই গল্প থেকে সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে মূল গল্পটি বেশ কয়েকবার পড়তে হবে। তবে, ছাত্রছাত্রীদের সুবিধার্থে ‘আদরিণী’ গল্প থেকে মনে রাখার মতো কিছু তথ্য তুলে ধরলাম। 

Adarini-by-BanglaSir
আদরিণী

আদরিণীঃ মনে রাখার মত তথ্য

আদরিণী গল্পটি প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের লেখা।

আদরিণী গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয় সাহিত্য পত্রিকায়, ভাদ্র ১৩২০ বঙ্গাব্দে। পরে এটি গল্পাঞ্জলি (১৯১৩) গল্প গ্রন্থে স্থান পায়।

আদরিণী গল্পের আদরিণী হল একটি পোষ্য হাতি। হাতির মালিকের নাম জয়রাম মুখোপাধ্যায়।

জয়রামবাবুর আদি নিবাস যশোর জেলায়। তার বর্তমান ঠিকানা চৌধুরীপাড়া।

জয়রাম মুখোপাধ্যায় একজন নামকরা মোক্তার। তার মেজাজ কিছুটা রুক্ষ হলেও মানুষ হিসেবে স্নেহপ্রবণ ছিলেন।

একবার এক ডেপুটির সঙ্গে জয়রামবাবুর বচসা হয় এবং বাড়ি ফিরে যখন তিনি দেখেন যে মঙ্গলা নামক গাইটি একটি এঁড়ে বাছুর প্রসব করেছে, তখন উক্ত ডেপুটিবাবুর নামে সেই বাছুরের নামকরণ করেন।

আরেক ডেপুটির সঙ্গে তার বচসা হওয়ায় আদালত অবমাননার দায়ে তার পাঁচ টাকা জরিমানা হয়েছিল। কিন্তু এই আদেশের বিরুদ্ধে তিনি হাইকোর্টে যান এবং ১৭০০ টাকা খরচ করে পাঁচ টাকা জরিমানা থেকে অব্যহতি পান।

একদিন জুনিয়র উকিল কুঞ্জবিহারী এবং পাড়ার নগেন ডাক্তার জয়রামবাবুর বাড়িতে আসেন। তারা পীরগঞ্জের বাবুদের মেজবাবুর মেয়ের বিয়ের নিমন্ত্রণ পেয়েছেন। জয়রামবাবু বিশ বছর ধরে তাদের এস্টেটের বাঁধা মোক্তার। তিনিও নিয়ন্ত্রণ পেয়েছেন। কিন্তু কীভাবে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যাবেন সেই নিয়েই সকলের ভাবনা।

গরুর গাড়িতে পীরগঞ্জে যেতে হলে যেতে দু’দিন এবং আসতে দু’দিন লাগবে। পালকি যোগাড় হওয়া মুশকিল। তাই একটি হাতির বন্দোবস্ত হলে ভালো হতো।

জয়রামবাবু মহারাজ নরেশচন্দ্র রায়ের কাছে একটি হাতি চেয়ে চিঠি পাঠালেন। কিন্তু হাতি পাওয়া গেল না। এই অবস্থায় কেউ কেউ পরামর্শ দিল, ইমামদ্দি শেখের নতুন বলদ জোড়া নিয়ে গরুর গাড়িতে পীরগঞ্জে যেতে।

এই ঘটনার পর জয়রাম মুখোপাধ্যায় দুই হাজার টাকার বিনিময়ে বীরপুরের উমাচরণ লাহিড়ীর একটি মাদি হাতি কেনেন। তার নাম রাখা হয় আদরিণী।

পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে অবস্থার অনেক পরিবর্তন ঘটে। জয়রামবাবুর বয়স বাড়ে এবং উপার্জন কমতে থাকে। শুধুমাত্র সুদের টাকায় সংসার চলে না, তাই মূলধনে হাত দিতে হয়। ফলে কোম্পানির কাগজের সংখ্যা কমতে থাকে।

ইংরেজি জানা শামলা পরা তরুণ উকিলদের তুলনায় শিথিল-নিয়মের আইন ব্যবসায়ী পাগড়ি বাঁধা মোক্তারদের কদর কমে যায়।

নতুন হাকিমরাও জয় রাম বাবু কে আর শ্রদ্ধার চোখে দেখেনা। তারা যেন মনে করে, “যে ইংরেজি জানে না, সে মনুষ্যপদবাচ্যই নহে”।

এই সময় একটি খুনি মোকদ্দমায় জয়রাম মুখোপাধ্যায় মোক্তার নিযুক্ত হয়েছিলেন এবং সেই মোকদ্দমা জিতেও ছিলেন। জজসাহেব জয়রাম বাবুর অনেক প্রশংসা করেছিলেন। তবে, তারপর থেকে তিনি আর কাছারিতে যাননি। অর্থাৎ খুনির মোকদ্দমাটাই ছিল তার মোক্তার হিসেবে জীবনের শেষ মোকদ্দমা।

জয়রামবাবুর তিন পুত্রের মধ্যে প্রথম দুটি নিষ্কর্মা এবং ছোট ছেলেটি কলকাতায় পড়াশোনা করত।

এই সময় অনেকেই আদরিনীকে বিক্রি করার পরামর্শ দেয় কারণ হাতিটির ভরণপোষণের জন্য মাসিক ত্রিশ চল্লিশ টাকা খরচ হত। এতে জয়রামবাবু রেগে যান।

এরপর তিনি হাতিটিকে ভাড়ায় দেওয়ার জন্য বিজ্ঞাপন দেন। হাতির ভাড়ার রোজ তিন টাকা এবং হস্তিনীর খোরাকি বাবদ এক টাকা মোট চার টাকা ভাড়া ধার্য করা হয়। কিন্তু তাতে মাসে ১৫/২০ টাকার বেশি আয় হতো না।

এমন সময় তার বড় নাতি অসুস্থ হয়ে পড়লে ওষুধ পথ্য বাবদ প্রতিদিন ৫/৭ টাকা খরচ হয়। মাসখানেক পরেছে সুস্থ হয়ে ওঠে।

তার বড় নাতনির নাম কল্যাণী। সে বারো বছরে পা দিলে তার জন্য পাত্র দেখা শুরু হয়। যার সঙ্গে কল্যাণীর বিবাহ স্থির হয় সেই পাত্রটি রাজশাহী কলেজে এল.এ পড়ছে। পাত্রপক্ষের দাবি অর্থাৎ বরপণ লাগবে দু হাজার টাকা এবং বিয়ের খরচ পাঁচশো টাকা।

জয়রামবাবুর বন্ধুরা আরো একবার হাতিটি বিক্রি করার পরামর্শ দেয়। দাম ধার্য করা হয় তিন হাজার টাকা। চৈত্র সংক্রান্তিতে বামুনহাটে একটি বড় মেলা বসে। সংক্রান্তির পনেরো দিন আগে মেলা শুরু হয় তবে শেষের চার পাঁচ দিন মেলা জমে। সংক্রান্তির এক সপ্তাহ আগে আদরিণীকে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। মাহুত আর জয়রামবাবুর মেজ ছেলে সঙ্গে যাবে।

১০ই জৈষ্ঠ্য কল্যাণীর বিয়ের দিন স্থির হয়। বৈশাখ মাসে আশীর্বাদ হওয়ার কথা কিন্তু ১লা বৈশাখ সন্ধ্যাবেলা আদরিণী বাড়ি ফিরে আসে, বিক্রি হয়নি।

বামুনহাটের দশ ক্রোশ উত্তরে রসুলগঞ্জে এক সপ্তাহব্যাপী মেলা বসে। মাহুত এবং জয়রামবাবুর মেজো ছেলে আদরিণীকে মেলায় নিয়ে যায়। বাড়ি থেকে সাত ক্রোশ দূরে গিয়ে আদরিনী অসুস্থ হয়ে একটি আমবাগানে শুয়ে পড়ে। মেজো ছেলে একটি চিঠি লিখে একজন চাষীলোকের হাতে পাঠিয়ে দেয়। চিঠি পেয়ে জয়রামবাবু তার বড় ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে আদরিণীকে দেখতে যান। রাত দশটায় গাড়ি ছাড়ে, পরদিন সকালে পৌঁছয়। আদরিণীর শবদেহ দেখে বৃদ্ধ কেঁদে ফেলেন। এর দুমাস পরেই জয়রামবাবু মারা যান।

দ্বাদশ শ্রেণির অন্যান্য পাঠঃ

error: Content is protected !!