মহাভারতের চরিত্রসমূহ

মহাভারতের চরিত্রসমূহ

Mahabharat3Dmovie.jpg
Image courtesy- Mahabharat 3D

একাদশ শ্রেণীর পাঠ্য কবিতা ‘নীলধ্বজের প্রতি জনা’ বোঝার জন্য যেসব চরিত্র এবং ঘটনা জানা দরকার-

শান্তনু – হস্তিনাপুরের মহারাজ শান্তনু একবার গঙ্গার তীরে একটি সুন্দরী মেয়েকে দেখে তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। মেয়েটি রাজী হয় এই শর্তে যে সে যা খুশি করবে কিন্তু তাকে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না। শান্তনু রাজী হয়। পরে তাদের একটি সন্তান হয়। সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটি তাকে গঙ্গার জলে ডুবিয়ে দিয়ে আসে। শান্তনু সব দেখেও জিজ্ঞাসা করতে পারেন না যেহেতু তিনি আগেই কথা দিয়েছেন। এভাবে মেয়েটি পরপর সাতজন সন্তানকে গঙ্গার জলে ডুবিয়ে দিয়ে আসে। তারপর যখন সে অষ্টম সন্তানকেও ডুবিয়ে মারতে যাচ্ছিল তখন মহারাজ মেয়েটিকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করেন। এরপর মেয়েটি শান্তনুকে সবকিছু জানায়- মেয়েটি আসলে অভিশপ্ত গঙ্গা আর শান্তনু হলেন অভিশপ্ত মহাভিষা, তাদের সন্তানগুলি অভিশপ্ত অষ্টবসু। অষ্টবসুর মধ্যে সাতজন আগেই মারা গেছে। এবার অষ্টম সন্তানটিকে নিয়ে গঙ্গা স্বর্গে চলে যান। ছেলেটি বড় হবার পর গঙ্গা শান্তনুর কাছে দিয়ে যায়। তার নাম দেবব্রত- পরে ভীষণ প্রতিজ্ঞা নেওয়ার জন্য নাম হয় ভীষ্ম। গঙ্গা চলে যাবার কিছুকাল পরে সত্যবতী নামে একজন মেয়ের সঙ্গে শান্তনুর বিয়ে হয়।

সত্যবতী– সত্যবতী শান্তনুকে বিয়ে করার আগে পরাশর মুনির বরে একটি সন্তানের জন্ম দেয়। তার নাম দ্বৈপায়ন অর্থাৎ দ্বীপে জন্ম যার। এই দ্বৈপায়নই হলেন বেদব্যাস যিনি মহাভারত রচনা করেন। কিন্তু সত্যবতী প্রথমে শান্তনুকে বিয়ে করতে রাজী হয়নি কারণ শান্তনু আর গঙ্গার পুত্র দেবব্রত তখন যুবক। তাই সত্যবতীর সন্তান কোনোদিনই সিংহাসন পাবে না। এই অবস্থায় দেবব্রত প্রতিজ্ঞা করে যে

  • ১) সে হস্তিনাপুরের সিংহাসনে বসবে না,
  • ২) কখনো বিয়ে করবে না আর
  • ৩) জীবনের শেষদিন পর্যন্ত, হস্তিনাপুরের সিংহাসনে যেই বসুন না কেন, তাকে সাহায্য করবে।

এই ভীষণ প্রতিজ্ঞার জন্য তার নাম হয় ভীষ্ম। শান্তনু আর সত্যবতীর দুই সন্তান- চিত্রাঙ্গদ আর বিচিত্রবির্য।

ভীষ্ম বিচিত্রবীর্য যখন বিয়ের যোগ্য হয় তখন ভীষ্ম তার জন্য মেয়ের সন্ধান করতে থাকে। কাশীরাজের তিনকন্যা – অম্বা, অম্বিকা আর অম্বালিকার স্বয়ম্বর সভার আয়োজন হয়েছিল। ভীষ্ম সেই সভায় গিয়ে বাকি রাজাদের হারিয়ে তিনজন মেয়েকে হস্তিনাপুরে নিয়ে আসেন বিচিত্রবীর্যের সঙ্গে বিয়ে দেবার জন্য। কিন্তু অম্বা জানায় যে সে মনে মনে শাল্বরাজাকে মনে মনে স্বামী বলে মেনে নিয়েছিল। তাই সে বিয়ে করতে পারবে না। ভীষ্ম তাকে শাল্বরাজার কাছে পাঠায় কিন্তু শাল্ব তাকে অস্বীকার করে। তখন অম্বা ভীষ্মকে বলে তাকে বিয়ে করতে। কিন্তু ভীষ্ম ইতিমধ্যে প্রতিজ্ঞা করেছে যে বিয়ে করবে না। শেষে অম্বা শিবের আরাধনা করে বর প্রার্থনা করে- এজন্মে না হোক, পরের জন্মে সে যেন ভীষ্মের মৃত্যুর কারণ হতে পারে।  এই অম্বাই পরের জন্মে শিখণ্ডী। শিখণ্ডী একজন নপুংসক- ক্লীবলিঙ্গ। ভীষ্ম প্রতিজ্ঞা করেছিল যে সে কোনো স্ত্রী বা ক্লীবের সামনে অস্ত্র ধরবেন না। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে শিখণ্ডীকে সামনে রেখে অর্জুন ভীষ্মকে হত্যা করে।

পাণ্ডব কৌরব– হস্তিনাপুর রাজবংশের একজন রাজার নাম ছিল কুরু। সেইজন্য ওই বংশের সকলেই কৌরব। কিন্ত সিংহাসন নিয়ে যখন দ্বন্দ্ব দেখা দিল তখন পাণ্ডুর পুত্রদের বলা হল পাণ্ডব। আসলে পাণ্ডবরাও কৌরব। যাইহোক, পাণ্ডুর জন্ম হল কীভাবে? আগেই বলেছি, বিচিত্রবির্যের দুই স্ত্রী- অম্বিকা এবং অম্বালিকা। কিন্তু বিচিত্রবির্য কোনো স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করলে তাঁর(বিচিত্রবির্যের) মৃত্যু হবে- এমন অভিশাপ ছিল। তাই বংশবৃদ্ধি হবে কীভাবে সেই নিয়ে সবাই চিন্তায় পড়ে যায়। এই প্রসঙ্গে বলি- তখনকার দিনে একটা প্রথা ছিল- নিয়োগ প্রথা। এই প্রথা অনুসারে একজন স্ত্রীলোক সন্তান জন্ম দেবার জন্য স্বামী ছাড়াও অন্য কোনো পুরুষকে নিয়োগ করতে পারতেন। বিচিত্রবির্যের মা সত্যবতীও তাই করলেন। তাঁর দুই পুত্রবধু অম্বিকা আর অম্বালিকার জন্য ব্যাসদেবকে (সত্যবতীর বিয়ের আগের সন্তান) নিয়োগ করলেন। এরপর দুই সন্তানের জন্ম হয়- অম্বালিকার  গর্ভে পাণ্ডু আর অম্বিকার গর্ভে ধৃতরাষ্ট্র। ধৃতরাষ্ট্র জন্ম থেকেই অন্ধ বলে পাণ্ডু সিংহাসনে বসেন। পাণ্ডুর দুই স্ত্রী- কুন্তী এবং মাদ্রি। পাণ্ডুকে কিন্ডাম মুনি অভিশাপ দিয়েছিলেন যে তিনি তাঁর কোনো স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করতে পারবেন না। ফলে পাণ্ডু নিঃসন্তান অবস্থায় সিংহাসন ত্যাগ করে ধৃতরাষ্ট্রকে সিংহাসনে বসিয়ে বনবাসে যান। এই অবস্থায় কুন্তী দুর্বাশা মুনির দেওয়া বর অনুসারে দেবতাদের আহ্বান করে পাঁচটি সন্তান লাভ করে। এদের মধ্যে প্রথম তিনজন কুন্তীর গর্ভে আর বাকি দুজন মাদ্রির গর্ভে জন্ম নেয়। এই পাঁচপুত্র হল- যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল ও সহদেব। এদেরকেই পরে পঞ্চপাণ্ডব বলা হত।

অর্জুন– অর্জুন হল মধ্যম পাণ্ডব- একজন বীর যোদ্ধা। তাঁর কৃতিত্ব অনেক। তার মধ্যে প্রধান হল- স্বয়ম্বর সভায় জিতে দ্রৌপদীকে বিবাহ করা, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ন প্রভৃতিকে বধ করা, খাণ্ডব বন দহন করা প্রভৃতি। কিন্তু অনেকে বলেন অর্জুন শ্রেষ্ঠ বীর নন। কারণ- দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভায় অর্জুন ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে গিয়েছিল বলে কোনো ক্ষত্রিয় রাজা অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধ করেননি। অর্থাৎ অর্জুন সকলকে ছলনা করেছিল, ঠকিয়েছিল। অর্জুন কৃষ্ণকে সঙ্গে নিয়ে খাণ্ডববন দহন করেছিল কিন্তু অস্ত্র এবং রথ দিয়ে সাহায্য করেছিল অগ্নিদেব। অগ্নিদেবের সাহায্য না পেলে অর্জুনের সাধ্য ছিল না একাজ করার। আবার কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অর্জুন কর্ণকে হত্যা করেছিল এমন সময় যখন কর্নের রথের চাকা মাটিতে বসে গিয়েছিল। আর পিতামহ অর্থাৎ ঠাকুরদা ভীষ্মকে অর্জুন বধ করেছিল শিখণ্ডীকে সামনে রেখে। শিখণ্ডী একজন নপুংসক বা ক্লীবলিঙ্গ আর সবাই জানত যে ভীষ্ম কোনো স্ত্রী বা ক্লীবের সামনে অস্ত্র ধারন করবেন না, তাই অর্জুন শিখণ্ডীকে সামনে রেখে ভীষ্মকে বধ করেছিল। অর্জুনের গুরু দ্রোনাচার্যকে বধ করা হয়েছিল মিথ্যে কথা বলে। সকলে মিলে বলেছিল যে তাঁর পুত্র অশ্বথামা মারা গেছে। এই শুনে দ্রোন সত্যিটা জানার জন্য ধ্যানে বসলে তাঁকে হত্যা করা হয়।

কুন্তী ও দ্রৌপদী– কুন্তী হল যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল, সহদেব- এই পঞ্চপাণ্ডবের জননী। কিন্তু অনেকে তাঁকে চরিত্রহীনা বলে সমালোচনা করেন। কারণ তাঁর বিয়ের আগেই এক সন্তানের জন্ম হয়- নাম কর্ন। পাণ্ডুকে বিয়ের পরেও কুন্তী দেবতাদের আহ্বান করে সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। পঞ্চপাণ্ডবের মধ্যে কেউ পাণ্ডুর নিজের সন্তান নয়। আবার, দ্রৌপদী হল পঞ্চপাণ্ডবের স্ত্রী। এক নারীর পাঁচ স্বামী। তাই দ্রৌপদীর চরিত্র নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। যদিও আমাদের পুরাণে কুন্তী এবং দ্রৌপদীকে কোনোভাবেই চরিত্রহীনা বলা হয়নি।

কর্ণ- কর্ণ হল কুন্তীর কুমারী অবস্থার সন্তান। কর্ণের পিতা সূর্য। কুমারী মা কুন্তী জন্মের পর কর্ণকে জলে ভাসিয়ে দিয়েছিল লোকলজ্জার ভয়ে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কর্ণ কৌরবদের সঙ্গে যোগদান করেছিল। কৌরবদের প্রধান দূর্যোধন ছিল কর্ণের বন্ধু। কর্ণ মহাভারতের অন্যতম বীর কিন্তু অর্জুন তাকে নিরস্ত্র অবস্থায় পেয়ে হত্যা করেছিল।  এইজন্য জনা অর্জুনকে বীর মানতে রাজী নয়।

কৃষ্ণ– হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী ভগবান বিষ্ণুর দ্বাপরযুগের অবতার হলেন কৃষ্ণ।  যদিও মহাভারতের একজন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ হিসেবেই কৃষ্ণের খ্যাতি বেশি। কৃষ্ণ অপরাজেয় যোদ্ধা এবং রাজনীতিবিদ। তিনি যে পক্ষেই যোগ দিতেন সেই পক্ষই যুদ্ধে জয়লাভ করত সেইজন্য কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তিনি সরাসরি কোনো পক্ষেই যোগ দেননি। পান্ডববীর অর্জুনের রথের চালক অর্থাৎ সারথী হয়ে কৃষ্ণ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে গিয়েছিলেন। যুদ্ধের সময় তার পরামর্শেই অর্জুন পান্ডবদের পরাজিত করেছিল।

জনা– মহাভারতের অশ্বমেধ পর্বে দেখা যায় যে, অর্জুন অশ্বমেধ যজ্ঞ করে তাঁর অশ্ব বা ঘোড়াটি ছেড়ে দেয়। হিসেবমত যে যে রাজ্যের উপর দিয়ে সেই ঘোড়া যাবে সেই সেই রাজ্যের রাজা অর্জুনের আনুগত্য স্বীকার করল আর যে সেই ঘোড়া বেঁধে ফেলবে তাঁর সঙ্গে অর্জুনের যুদ্ধ হবে। সকলেই অর্জুনের বীরত্বের কথা জানত বলে কেউ সেই ঘোড়ার পথ রোধ করেনি। যখন সেই ঘোড়া মাহেশ্বর-পুরী রাজ্যে যায় তখন সেখানকার রাজপুত্র প্রবীর ঘোড়াটিকে বাঁধে। ফলে অর্জুন এসে প্রবীরকে হত্যা করে। প্রবীরের বাবা নীলধ্বজ অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে যাচ্ছিল কিন্তু তাঁর জামাই অগ্নিদেব বলে যে অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধ করলে হারতে হবে, বরং সন্ধি করাই বুদ্ধিমানের কাজ। তাই নীলধ্বজ রাজা অর্জুনকে সিংহাসনে বসিয়ে নাচ-গানের আয়োজন করেন। কিন্তু প্রবীরের মা জনা এই ঘটনা কোনো মতেই মানতে পারেনি। জনার দুঃখ যে তাঁর একমাত্র পুত্র প্রবীর মারা গেছে। কিন্তু তার চেয়েও বড় দুঃখ যে তাঁর পুত্রের হত্যাকারী অর্জুনকে সিংহাসনে বসিয়ে তাঁর স্বামী নীলধ্বজ আনন্দোৎসব করছে। দুঃখে, ক্ষোভে, অপমানে জনা গঙ্গার জলে নিজের প্রাণ বিসর্জন দেয়।

error: Content is protected !!